Press ESC to close

গুমে থাকা এক ভাইয়ের স্মৃতিচারণ!!

মানুষ জীবনে গুমের সময় যে কতটা ভয়ংকর মানসিক যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে যায়, সেটা বোঝানো যায় না। জেলখানার সেই নিঃশব্দ অবসর আর ব্যস্তহীন সময়ে, ছোট্ট একটা রুমের লোহার গ্রিল ধরে দূরের আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকলে বারবার সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে। বুকের ভেতর কেমন করে ওঠে, চোখের কোণে জমে ওঠে না বলা কত কষ্ট।

গুম থাকা অবস্থায় কয়েক সপ্তাহ পর এক রাতে কনস্টেবলদের একজনের মুখে শুনেছিলাম আরেক বন্দির কাহিনী। ছেলেটাকে “shatime রাসূল হত্যা মামলার” সন্দেহভাজন বলে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। বাবা-মা আদর করে ছেলেকে বিয়ে দিয়েছে, নতুন বউকে ঘরে তুলে আনার প্রস্তুতি চলছে—ঠিক সেই সময় সাদা পোশাকের কিছু লোক এসে তাকে তুলে নিয়ে যায়।

গ্রেপ্তারের পর তার ওপর শুরু হয় অমানুষিক নির্যাতন। দিনের পর দিন ঝুলিয়ে রাখা, হাঁটুতে আঘাত, কাপড় দিয়ে চোখ-মুখ বেঁধে পানি ঢালা। তার নতুন স্ত্রীকে নিয়ে অশ্লীল, জঘন্য গালাগালি, বারবার হুমকি—“ধরে এনে সম্মানহানি করব, ধর্ষণ করব।” এসব কথা বলে তাকে ভেঙে ফেলার চেষ্টা, মিথ্যা স্বীকারোক্তি আদায়ের নোংরা কৌশল।

সবচেয়ে আশ্চর্য লেগেছিল তখন, যখন এক কনস্টেবল বলেছিল—

“যারা আল্লাহ ও রাসূল ﷺ–কে ভালোবেসে তাঁর সম্মান রক্ষার জন্য এত জুলুম নির্যাতন সহ্য করতে পারে, এমনকি মৃত্যুকে বরণ করে নিতে পারে, তারা আল্লাহর ওলী ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না। এত অত্যাচার তখনই কেউ সহ্য করতে পারে, যখন তার বুক ভরা থাকে আল্লাহ আর তাঁর রাসূল ﷺ–এর ভালোবাসায়।”

ওরা আরও বলছিল,

“সত্যিকারের পুরুষ সেই, যে শত নির্যাতনের পরেও আল্লাহ ও রাসূলের সম্মানের বিরুদ্ধে একটি কথাও বলবে না। নিজের প্রাণ বাঁচাতে মিথ্যা স্বীকারোক্তি দেবে না, অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে দেবে না, কাউকে ফাঁসিয়ে দেবে না।”

আসলে মানুষ যখন দীর্ঘদিন হাত-পা বাঁধা, চোখ বাঁধা অবস্থায় নির্যাতনের ভেতর দিয়ে যায়, তখন বাঁচার আশায় অনেকেই মিথ্যা স্বীকারোক্তির দিকে ঝুঁকে পড়ে, কিংবা অন্যের ওপর দোষ চাপাতে চায়। এটা মানুষের স্বাভাবিক দুর্বলতা। কিন্তু কিছু মানুষ আছেন, যাদের ঈমান এই দুর্বলতার ঊর্ধ্বে।

এই কথাগুলো শোনার পর আমার মনে ভীষণ কৌতূহল জন্মেছিল। কে সেই মানুষ, যাকে নিয়ে এত প্রশংসা? এত দৃঢ়, এত অবিচল কে? জিজ্ঞেস করতে ভয় পাচ্ছিলাম। তখন আমি নিজেও নতুন করে গুম থেকে আসা, শরীরজুড়ে আঘাতের দাগ, রক্তাক্ত যন্ত্রণা। কথা বলা, প্রশ্ন করা—সবই নিষেধ। তবুও ভয়কে জয় করে আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে জিজ্ঞেস করেছিলাম।

তখন তারা শুধু একটি নাম বলেছিল—

“শরীফ।”

আরও কয়েক মাস পর বুঝলাম, এই শরীফ আসলে আমাদের প্রিয়, সাহসী, অবিচল

মুকুল রানা ভাই।

আজও ভাবলে শরীর কেঁপে ওঠে, চোখ ভিজে যায়।

কতটা ঈমান, কতটা ভালোবাসা, কতটা সাহস থাকলে মানুষ এমন জুলুমের মাঝেও মাথা নত করে না!

কতটা শক্ত হৃদয় হলে মানুষ নিজের সম্মান, নিজের জীবন, এমনকি পরিবারের নিরাপত্তার ভয়কে পাশ কাটিয়ে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ–এর সম্মান রক্ষায় অটল থাকতে পারে!

আপনি শুধু একজন মানুষ নন, ভাই।

আপনি আমাদের জন্য প্রেরণা।

আপনি প্রমাণ করে গেছেন—

আসল পুরুষত্ব কণ্ঠের জোরে নয়, অস্ত্রের শক্তিতে নয়,

আসল পুরুষত্ব ঈমানের দৃঢ়তায়, সত্যের ওপর অটল থাকার শক্তিতে।

আল্লাহ আপনাকে কবুল করুন,

আপনার কষ্টকে ইবাদতে পরিণত করুন,

আপনাকে তাঁর প্রিয় বান্দাদের কাতারে শামিল করুন।

আমিন।