মুকুল রানা ভাইকে যেদিন ক্রসফায়ার দেওয়া হবে, তার কয়েকদিন আগেই আমরা একটা অদ্ভুত পরিবর্তন টের পাচ্ছিলাম। সবকিছু কেমন জানি আমাদের কাছ থেকে লুকানোর চেষ্টা চলছিল। আমাদের পরস্পরকে আলাদা আলাদা রুমে নিয়ে যাওয়া হতো, কারো সাথে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হতো না। এমনকি রুমের টিভিগুলোও অন করা থাকলেও খবরের চ্যানেল বন্ধ করে দেওয়া হতো, যেন আমরা বাইরের কিছুই জানতে না পারি।
সেদিন বিকেলের পর থেকেই পরিবেশটা আরও ভারী হয়ে উঠল। সবাই আমাদের নিয়ে ফিসফিস করে কথা বলছিল, চারদিকে একটা চাপা গুঞ্জন, অদ্ভুত এক নীরবতা আর কঠোরতা। মনে হচ্ছিল বাতাসের মধ্যেই কিছু অশুভ ভয় লুকিয়ে আছে।
রাত নামতেই সব লাইট বন্ধ করে অন্ধকার করে রাখা হলো। রংগুলো, আলো-ছায়ার সব চিহ্ন মুছে দিয়ে চারপাশকে নিস্তব্ধ করে দেওয়া হলো। রাত যত গভীর হচ্ছিল, বুকের ভেতরের অজানা আশঙ্কা ততই ভারী হচ্ছিল।
পরের দিন সকালে দেখি সবার কথা বলা প্রায় বন্ধ। টিভিগুলোও বন্ধ। কয়েকদিন পর ধীরে ধীরে আমরা খবরের টুকরো টুকরো অংশ জানতে পারলাম, নিউজে দেখলাম। তারপর এক অফিসারের কাছ থেকে, সাব-ইন্সপেক্টরের মাধ্যমে শুনলাম মুকুল ভাইয়ের ক্রসফায়ারের ভয়ংকর কাহিনী।
যেদিন তাকে নিয়ে যাওয়া হয়, সেদিন অদ্ভুতভাবে তাকে নিচে নামিয়ে গোসল করতে দেওয়া হয়েছিল। অথচ তার আগের কয়েকদিন তাকে গোসলও করতে দেওয়া হতো না। রাতে খাবার খাবে কিনা, সেটাও জিজ্ঞেস করা হয়েছিল। যেহেতু রমজান মাস ছিল, তিনি সেহরি খাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। সেদিন হঠাৎ করেই ভাইয়ের সাথে তাদের আচরণ অনেক নরম হয়ে যায়, অনেক ভালো ব্যবহার শুরু করে। যেন সবকিছুই এক ধরনের বিদায়ী অভিনয়।
গাড়ি অনেকদূর চলার পর, চোখ বাঁধা অবস্থায় তাকে গাড়ি থেকে নামানো হয়। কিছু দূর গিয়ে তারা গুলি করার চেষ্টা করে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, বারবার চেষ্টা করেও তাদের পিস্তল থেকে গুলি বের হচ্ছিল না। একের পর এক ব্যর্থ চেষ্টা। তখন তারা নিজেরাই ভয় পেয়ে যায়, দুশ্চিন্তায় অস্থির হয়ে পড়ে। মনে হচ্ছিল যেন প্রকৃতি নিজেই এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গেছে।
পরবর্তীতে তারা আরেকজন কনস্টেবলকে ডাকে—নাম ছিল সিসি মনি, সম্ভবত হিন্দু বা চাকমা টাইপের নাম। তার পিস্তল দিয়ে গুলি করার চেষ্টা করা হয়, আর সেখান থেকেই গুলি বের হয়। সেই মুহূর্তে মুকুল ভাই আমাদের মাঝ থেকে চিরতরে হারিয়ে যান।
এই ঘটনার পর থেকেই তাদের মনোভাব বদলাতে শুরু করে। আমাদের বাকিদের ব্যাপারে ক্রসফায়ারের সিদ্ধান্ত তারা পরিবর্তন করে। ধীরে ধীরে, কয়েক মাসের ব্যবধানে, সবাইকেই মিডিয়ার সামনে আনা হয়। যেন মুকুল ভাইয়ের রক্তের দামেই আমাদের জীবনের দরজা আবার একটু খুলে যায়।
মুকুল ভাই আমাদের জন্য শুধু একজন মানুষ ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক নিঃশব্দ ত্যাগের নাম। তার সেই শেষ রাত, শেষ গোসল, শেষ সেহরির ইচ্ছা—সবকিছু আজও আমাদের বুকের ভেতর কাঁদে। ভালোবাসা, কষ্ট আর দোয়ায় ভেজা এক স্মৃতি হয়ে তিনি আমাদের হৃদয়ে বেঁচে আছেন চিরদিন।
– মুকুল রানার সাথে গুম থাকা কোন এক ভাই ।