সময়টা বিশ শতকের মাঝামাঝি, গুয়াতেমালার প্রেসিডেন্ট জ্যাকোবো আরবেনজকে ক্ষমতাচ্যুত করার ব্যাপারে উঠে পড়ে লাগে আমেরিকা। আরো পার্টিকুলারলি বলতে গেলে (United Fruit Company)। আর এই মনোবাসনাকে বাস্তবে রূপ দেয় CIA। কমিউনিজমের অভিযোগ এনে প্রেসিডেন্ট জ্যাকোবোকে CIA-এর প্রকাশ্য মদদে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়।
শুধু গুয়াতেমালাই নয়, বিংশ শতকের শুরু থেকেই ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোতে আমেরিকা যখন-তখন হস্তক্ষেপ শুরু করে, বিদ্রোহ উসকে দিতে থাকে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কেন এই হস্তক্ষেপ? কেন কমিউনিজমের জুজুর ভয়? আর এর সঙ্গেই বা United Fruit Company-এর মত একটি কর্পোরেট কোম্পানির সম্পর্ক কী?
সম্পর্ক বুঝতে হলে, আমাদের একটু পিছিয়ে যেতে হবে। উনবিংশ শতকের শেষের দিকে আমেরিকায় হঠাৎ কলার জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। আর এই জনপ্রিয়তাকে মুনাফায় রূপান্তরিত করতে ১৮৯৯ সালে গড়ে ওঠে United Fruit Company, যা এখন চিকিতা ব্র্যান্ড (Chiquita Brands International) নামে পরিচিত। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, কলা দ্রুত পচনশীল, আর আপনি বড় পরিমাণে এর উৎপাদন এবং বিক্রি না করতে পারলে লাভবান হতে পারবেন না। সমাধান কী?
সমাধান হচ্ছে, অন্যান্য সব প্রতিযোগীকে উঠতে না দেওয়া এবং ব্যাপক পরিমাণ জমির উপর কলা উৎপাদন শুরু করা। আর এই কলা উৎপাদনের জায়গা হিসেবে বেছে নেওয়া হয় ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোকে। বিশেষভাবে বলতে গেলে হন্ডুরাস, গুয়াতেমালা, নিকারাগুয়া। এসব দেশের ভূমি দখল করে United Fruit Company কলা চাষ শুরু করে। শ্রমিকদের দেওয়া হতো নামমাত্র বেতন। মজার ব্যাপার হচ্ছে, বেতন হিসেবে তাদের কোনো অর্থ দেওয়া হতো না, দেওয়া হতো টোকেন। যে টোকেনের সাহায্যে শ্রমিকরা শুধুমাত্র United Fruit Company-এর দোকান থেকেই পণ্য ক্রয় করতে পারত। এত সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার পরেও শ্রমিকরা বিদ্রোহ করতে শুরু করে। আর বিদ্রোহ দমাতে শুরু হয় দমন-নিপীড়ন।
এক সময় কমিউনিজমের জুজুর ভয় দেখিয়ে মার্কিন সেনাবাহিনী হস্তক্ষেপ করতে শুরু করে ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোতে। নিজেদের ভূমি না দিতে চাওয়ার কারণে CIA গুয়াতেমালার প্রেসিডেন্টকে উৎখাত করে, তার জায়গায় নিজেদের পুতুলকে বসায়। শুধুমাত্র নিজেদের কর্পোরেট, নিজেদের অর্থনৈতিক আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে। এই Banana Wars-এ ল্যাটিন আমেরিকায় কয়েক লাখ মানুষকে হত্যা করা হয়, নির্যাতন করা হয়, ঘরবাড়ি ছাড়া করা হয়, অর্থনীতি ভেঙে ফেলা হয়। যার প্রভাব এখনো ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলো কাটিয়ে উঠতে পারেনি।
এই একবিংশ শতকে এসেও আমেরিকা তার আধিপত্যবাদকে ধরে রেখেছে। শুধুমাত্র কমিউনিজম হয়ে গেছে War on Terror, আর কলা হয়ে গেছে পেট্রোডলার। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধে আমেরিকা তার আধিপত্যবাদ টিকিয়ে রাখতে যেখানে খুশি সেখানে বোমাবর্ষণ করেছে, কেমিক্যাল ওয়েপন ব্যবহার করেছে, অবরোধ দিয়েছে। আর যাদের এই আধিপত্যবাদকে রুখে দিতে চেয়েছে, তাদের মিডিয়া ওয়াশের মাধ্যমে সন্ত্রাসী, জঙ্গি ট্যাগ দিয়েছে।
আমেরিকার সাম্রাজ্যের জন্মই হয়েছে নেটিভ আমেরিকানদের (রেড ইন্ডিয়ানদের) পাইকারি হত্যার মাধ্যমে। এই সাম্রাজ্য তারা টিকিয়ে রেখেছে জুলুম, রক্ত আর মিডিয়া সন্ত্রাসের উপর। আফসোসের বিষয় হচ্ছে, মজলুমরা আমেরিকার মিডিয়া সন্ত্রাসের কাছে পরাজিত হয়ে তাদের নিজেদের হিরোদের সন্ত্রাসী হিসেবে চিনছে। যারা তাদের জন্য সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়ছে, তাদেরকেই জঙ্গি তকমা দিচ্ছে। আর আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করছে। যেমনটা বুশ বলেছিলেন, “Either you are with us or with the terrorist.”