Press ESC to close

জালিমের বন্দিশালা থেকে – ২

গুমের ভেতরের সময়টা যেন সময় না, একেকটা মুহূর্ত একেকটা যুগের মতো লম্বা লাগে। বিশেষ করে যখন

হাতে হ্যান্ডকাফ, পায়ে হ্যান্ডকাফ, চোখ-মুখ কাপড় দিয়ে শক্ত করে বাঁধা, চারদিক থেকে লাঠির আঘাত আর লাথির শব্দ—প্রতিটা সেকেন্ড বুকের ভেতর আতঙ্ক হয়ে নেমে আসে। মনে হয় শ্বাস নিলেও যেন অপরাধ।

সারাদিন তেমন কিছু না হলেও বিকাল নামলেই শুরু হয় অমানবিকতা। রাত যত গভীর হয়, তাদের পশুত্ব তত জেগে ওঠে। অন্ধকারের সাথে সাথে যেন মানুষের চেহারা ছেড়ে তারা অন্য কিছুর রূপ নেয়।

একটা বিষয় খুব কষ্ট দিত…

দেখতাম, ডিবির অনেক অফিসার তাদের স্ত্রীদের সাথে ফোনে কত নরম হয়ে কথা বলে।

কত ভালোবাসা, কত মায়া মিশানো কণ্ঠ।

কারণ তাদের স্ত্রীদের সন্দেহ—রাতে তারা অফিসে নাকি অন্য কোথাও কোনো নারীর সাথে? আর যখন

ঝগড়া হয়, তর্ক হয়, আর সেই রাগের আগুন এসে পড়ে আমাদের শরীরের উপর।

অনেক সময় বলতে শুনেছি,

“শালা তোদের জন্য আজ আমরা আমাদের স্ত্রীদের সাথে থাকতে পারি না।

সারারাত তোদের পাহারা দিতে হয়, আর আমাদের স্ত্রীরা আমাদের সন্দেহ করে।”

এই কথা বলতে বলতেই তারা সারারাত ধরে আমাদের উপর লাথি, গুঁতা, গালাগালি চালিয়ে যেত।

যতক্ষণ না তাদের ঘুম আসত, ততক্ষণ আমাদের শরীরটাই ছিল তাদের রাগ ঝাড়ার জায়গা।

একদিনের কথা আজও ভুলতে পারি না। রমনা জোনাল টিমের এডিসি রাজিব খুব মারছিল। কারণ দিনের বেলা তাদেরকে মিথ্যা কথা বলে বিভিন্ন জায়গা থেকে ঘুরিয়ে অনেক লম্বা সময় ধরে ঘুরপাক খেয়েছিল। আর তারা যখন বুঝছিল তাদেরকে শুধু-শুধুই ঘোরাচ্ছে, তখন তারা গাড়িতে খুব মারধর করছিল আর বারবার বলছিল, শালা তোরে অফিসে নিয়ে গিয়ে ইচ্ছামতো বানাবো।।

হঠাৎ তার স্ত্রীর ফোন।

স্ত্রী বিশ্বাস করছিল না সে সত্যিই ডিবি অফিসে আছে।

তখন সে মারতে মারতেই ভিডিও কলে দেখাল—আমাদের হাত-পা হ্যান্ডকাফ আর চোখ-মুখ কাপড় দিয়ে বাঁধা, আহত শরীর বিভিন্ন জায়গা থেকে রক্ত ঝরছিল।।

তখন তার স্ত্রী বিশ্বাস করল। আর লাউডস্পিকার থাকার কারণে ও প্রান্ত থেকে তার স্ত্রী বলছিল,

“তুমি তো বারে যাও, ডিস্কোতে যাও, হোটেলে কল গার্লদের সাথে থাকো, মদ খাও…” তোমাকে বিশ্বাস করা অনেক কঠিন।।

ভাবুন একবার…

যে মানুষগুলো আমাদের রক্তে হাত রাঙায়,

মিথ্যা জঙ্গি নাটক সাজিয়ে

মিথ্যা মামলা জবানবন্দি দিয়ে

প্রমোশনের জন্য, বেশি আয়ের জন্য

তাদের স্ত্রী-সন্তানদেরকে আরাম-আয়েশে রাখার জন্য

আর তাদের নিজেদের স্ত্রীরাই তাদের বিশ্বাস করে না।

এই সব কষ্টের মাঝেও এক অদ্ভুত প্রশান্তি বুকের ভেতর এসে দাঁড়াত।

ভাবতাম,

তাদের স্ত্রীরা সন্দেহ করে, অবিশ্বাস করে।

আর আমাদের স্ত্রীরা?

তারা নির্ঘুম রাত কাটায় মহান আল্লাহ তাআলার দরবারে আর সেজদায় গিয়ে চোখের পানি ফেলে দোয়ায়। তারা জানে না আমরা বেঁচে আছি নাকি মরে গেছি, তবুও মহান আল্লাহর কাছে হাত তুলে বলে,

“হে আল্লাহ, আমার স্বামীকে তুমি বাঁচিয়ে রেখো।

শত জুলুমের মাঝেও তাকে সুস্থ রেখো।”

আমাদের সন্তানরা অপেক্ষা করে।

তারা জানে না বাবা কোথায়,

কিন্তু জানে—একদিন বাবা ফিরবে।

ফিরে এসে আবার তাদের মাথায় হাত রাখবে,

আদর করবে, বুকে জড়িয়ে নেবে।

এখানেই আমাদের শক্তি।

এখানেই আমাদের বিজয়।

যাদের হাতে জুলুম,

তাদের ঘরে অবিশ্বাস।

আর যাদের উপর জুলুম,

তাদের ঘরে দোয়া, ভালোবাসা আর অপেক্ষার আলো।

এই ভালোবাসাই আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে।

এই দোয়াই আমাদের ভাঙেনি।

— হাসিনার আয়নাঘরে জুলুমের শিকার এক ভাই। যাকে গুম-নির্যাতন করে মিথ্যা মামলার জোর করে স্বীকারোক্তি আদায় করে এখনো কারাগারে বন্দি রাখা হয়েছে।